school feeding

পুষ্টিকর খাবারে বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র রংপুর বিভাগের ২২ উপজেলায় ইএসডিও’র স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব

পুষ্টিকর খাবারে বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র
রংপুর বিভাগের ২২ উপজেলায় ইএসডিও’র স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব-
রংপুর বিভাগের প্রত্যন্ত গ্রাম, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো শিশুর কাছে এখন বিদ্যালয় মানেই শুধু পড়াশোনা নয়, বরং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারেরও নিশ্চয়তা। প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে সিদ্ধ ডিম, বনরুটি, দুধ, বিস্কুট ও পাকা কলা। ফলে বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি শিক্ষার প্রতি আগ্রহও তৈরি হয়েছে নতুনভাবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। বর্তমানে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ২২টি উপজেলায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে রংপুর জেলার রংপুর সদর উপজেলা; কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, চিলমারী, রাজারহাট ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা; গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী ও গাইবান্ধা সদর উপজেলা; নীলফামারী জেলার জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা; লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম ও কালিগঞ্জ উপজেলা; দিনাজপুর জেলার বিরামপুর, বিরল, বোচাগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও কাহারোল উপজেলা; পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারি, বোদা, দেবীগঞ্জ ও পঞ্চগড় সদর উপজেলা এবং ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা।
ইএসডিও সূত্রে জানা যায়, মোট ৩ হাজার ৩৭৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭২ জন শিক্ষার্থীর মাঝে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অপুষ্টি দূর করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিন নির্ধারিত খাদ্য তালিকা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে সিদ্ধ ডিম, বনরুটি, তরল দুধ, বিস্কুট ও পাকা কলা। এসব খাবার শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ এবং শিক্ষার প্রতি মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এই খাদ্য সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি পুষ্টির উৎস হয়ে উঠেছে।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরুর পর থেকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে বিদ্যালয়ে গড় উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক শিশু যারা অনিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে আসত, তারাও এখন নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিচ্ছে।
একজন সহকারী শিক্ষক জানান, ‘আগে অনেক শিক্ষার্থী সকালে না খেয়ে স্কুলে আসত। এতে ক্লাসে তাদের মনোযোগ কম থাকত। এখন খাবার পাওয়ার কারণে তারা আগ্রহ নিয়ে স্কুলে আসে এবং ক্লাসেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।’
চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলে জানা গেছে, দরিদ্র পরিবারের জন্য এই কর্মসূচি বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। অনেক পরিবার এখন শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে আরও আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
এই কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিন তাজা খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ২২টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৭৪৮ জন হতদরিদ্র নারী এই কার্যক্রমের সঙ্গে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
প্রতিদিন ভোরে তারা নিজ দায়িত্বে হাঁস-মুরগির তাজা ডিম সিদ্ধ করেন, ভালো মানের কলা সংগ্রহ করেন এবং সময়মতো বিদ্যালয়ে সরবরাহ করেন। এর মাধ্যমে তারা পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক নারী এখন নিজেদের আয় দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে সক্ষম হচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ফলে প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পুষ্টিকর খাবারের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যগত উন্নতি যেমন হচ্ছে, তেমনি তাদের মেধা বিকাশ ও শিক্ষার মানও উন্নত হচ্ছে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এই কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতেও স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়ে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুধু একটি খাদ্য সহায়তা প্রকল্প নয়, বরং এটি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের একটি কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

Leave a Reply